০৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈশ্বরদী উপজেলায় অনলাইন জুয়া খেলে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে

Nurunnobi
  • Update Time : ০৬:২৮:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / ৩৬৭ Time View

Oplus_16908288

ঈশ্বরদী সংবাদদাতাঃ
পাবনার ঈশ্বরদীতে এখন বিনোদনের পরিবর্তে ভয়ংকর আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইন জুয়া। উপজেলায় অনলাইন জুয়া খেলে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে। ইন্টারনেট-ভিত্তিক বিভিন্ন বাজি ও ভাগ্যনির্ভর এই খেলা বর্তমানে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিকাশ, রকেট ও নগদের মাধ্যমে সহজে টাকা জমা করার সুযোগ থাকায় এর প্রসার দ্রুত বাড়ছে, যা আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে। গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, জনতা ব্যাংক পাকশী শাখার ম্যানেজার খালেদ সাইফুল্লাহ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার পেছনে অনলাইন জুয়ায় তাঁর আসক্তিই প্রধান কারণ ছিল। আইন ও সচেতনতার অভাবে এটি এলাকার সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগজনক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ফতেমহোম্মদপুর, কাশফুলতলা এবং সাড়া অঞ্চলে জুয়ার আসক্তি বিশেষ ভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।

ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে নিয়মিত এই ধরনের অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় ইন্টারনেট থেকে অর্থ আয়ের চেষ্টা করতে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেক তরুণ এই জুয়ার অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। এই ভয়াবহতা এখন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। চা-এর দোকান থেকে শুরু করে অবসরের যেকোনো সময়ে হাতে স্মার্টফোন নিয়ে ধ্বংসের এই উন্মাদনা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে। কালিকাপুর এলাকার একটি স্থানীয় চায়ের দোকানে দেখা যায়, কিছু মানুষ মোবাইলে লুডো খেলছেন, যা মূলত জুয়ার অংশ। অনলাইন জুয়ার প্রবণতা ফতেমহোম্মদপুর ও সাঁড়া এলাকায় তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। এই অঞ্চলগুলোতে জুয়ার আসক্তি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

এই অনলাইন জুয়া এখন শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জনতা ব্যাংক পাকশী শাখার ম্যানেজার খালেদ সাইফুল্লাহ নিজেই অনলাইন জুয়ায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সম্প্রতি ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন। এছাড়াও, অনলাইন জুয়াতে আসক্ত হয়ে অনেক শিক্ষক দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। এমনকি একজন গৃহনির্মাণ শ্রমিক (ঘরামী) জুয়া খেলার জন্য নিজের শখের অ্যাপাচি বাইক পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আসক্তি সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এক জুয়াড়ির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি আয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় না করে অনলাইনে জুয়ায় ব্যয় করেন, যদিও তাঁর বিশ্বাস, এর মাধ্যমে তিনি আয় বৃদ্ধি করছেন। এই আসক্তি প্রথমে ব্যক্তি ও তার নির্ভরশীল পরিবারকে গ্রাস করে, এরপর সমাজ এবং ধীরে ধীরে পুরো এলাকাকেই প্রভাবিত করে। ফলে পরিবারে সঞ্চয় ও মূলধন নষ্ট হয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। ফতেমহোম্মদপুরের একজন জুয়াড়ি বলেন, ‘আমি আমার আয়কে বৃদ্ধি করতেই এমনটা করি।

সব মিলিয়ে, অনলাইন জুয়া এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি করছে না, পুরো সমাজের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করছে। ব্যাংক ম্যানেজারের দুর্নীতিতে জুয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং শিক্ষক ও শ্রমিকের মতো। পেশাজীবীদের আসক্তি সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও তরুণদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করাই হতে পারে এই আসক্তি থেকে মুক্তির স্থায়ী সমাধান। সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অনলাইন জুয়া রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

Tag :

Share This Post

About Author Information

ঈশ্বরদী উপজেলায় অনলাইন জুয়া খেলে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে

Update Time : ০৬:২৮:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

ঈশ্বরদী সংবাদদাতাঃ
পাবনার ঈশ্বরদীতে এখন বিনোদনের পরিবর্তে ভয়ংকর আসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইন জুয়া। উপজেলায় অনলাইন জুয়া খেলে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়েছে। ইন্টারনেট-ভিত্তিক বিভিন্ন বাজি ও ভাগ্যনির্ভর এই খেলা বর্তমানে স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিকাশ, রকেট ও নগদের মাধ্যমে সহজে টাকা জমা করার সুযোগ থাকায় এর প্রসার দ্রুত বাড়ছে, যা আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করছে। গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, জনতা ব্যাংক পাকশী শাখার ম্যানেজার খালেদ সাইফুল্লাহ ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার পেছনে অনলাইন জুয়ায় তাঁর আসক্তিই প্রধান কারণ ছিল। আইন ও সচেতনতার অভাবে এটি এলাকার সব শ্রেণি পেশার মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগজনক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ফতেমহোম্মদপুর, কাশফুলতলা এবং সাড়া অঞ্চলে জুয়ার আসক্তি বিশেষ ভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।

ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবে নিয়মিত এই ধরনের অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় ইন্টারনেট থেকে অর্থ আয়ের চেষ্টা করতে গিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে সঠিক জ্ঞানের অভাবে অনেক তরুণ এই জুয়ার অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। এই ভয়াবহতা এখন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। চা-এর দোকান থেকে শুরু করে অবসরের যেকোনো সময়ে হাতে স্মার্টফোন নিয়ে ধ্বংসের এই উন্মাদনা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করছে। কালিকাপুর এলাকার একটি স্থানীয় চায়ের দোকানে দেখা যায়, কিছু মানুষ মোবাইলে লুডো খেলছেন, যা মূলত জুয়ার অংশ। অনলাইন জুয়ার প্রবণতা ফতেমহোম্মদপুর ও সাঁড়া এলাকায় তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। এই অঞ্চলগুলোতে জুয়ার আসক্তি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

এই অনলাইন জুয়া এখন শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জনতা ব্যাংক পাকশী শাখার ম্যানেজার খালেদ সাইফুল্লাহ নিজেই অনলাইন জুয়ায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি সম্প্রতি ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন। এছাড়াও, অনলাইন জুয়াতে আসক্ত হয়ে অনেক শিক্ষক দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। এমনকি একজন গৃহনির্মাণ শ্রমিক (ঘরামী) জুয়া খেলার জন্য নিজের শখের অ্যাপাচি বাইক পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, আসক্তি সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে।

এক জুয়াড়ির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি আয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ সঞ্চয় না করে অনলাইনে জুয়ায় ব্যয় করেন, যদিও তাঁর বিশ্বাস, এর মাধ্যমে তিনি আয় বৃদ্ধি করছেন। এই আসক্তি প্রথমে ব্যক্তি ও তার নির্ভরশীল পরিবারকে গ্রাস করে, এরপর সমাজ এবং ধীরে ধীরে পুরো এলাকাকেই প্রভাবিত করে। ফলে পরিবারে সঞ্চয় ও মূলধন নষ্ট হয়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে। ফতেমহোম্মদপুরের একজন জুয়াড়ি বলেন, ‘আমি আমার আয়কে বৃদ্ধি করতেই এমনটা করি।

সব মিলিয়ে, অনলাইন জুয়া এলাকার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুতর হুমকি। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি করছে না, পুরো সমাজের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করছে। ব্যাংক ম্যানেজারের দুর্নীতিতে জুয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং শিক্ষক ও শ্রমিকের মতো। পেশাজীবীদের আসক্তি সমাজের জন্য এক অশনি সংকেত। এই সমস্যা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর আইন প্রয়োগ ও তরুণদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করাই হতে পারে এই আসক্তি থেকে মুক্তির স্থায়ী সমাধান। সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য অনলাইন জুয়া রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।