০৮:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্কুলের মাঝখানে আ.লীগ নেতার তিনতলা ভবন, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে

Nurunnobi
  • Update Time : ১২:২৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • / ৪৭০ Time View

Oplus_16908288

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
পাবনার সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার অবৈধভাবে নির্মিত তিনতলা ভবন শিক্ষার পরিবেশকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। শহীদ মিনার ঘেঁষে স্কুলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যক্তিগত ভবনটিকে কেন্দ্র করে ভোগান্তির শেষ নেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। দ্রুত ভবনটি উচ্ছেদ করে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণের অভিযোগের তীর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বাতেনের দিকে, যিনি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা এবং সাবেক যুবলীগ নেতা। তিনি চরতারাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর চাচাতো ভাই। এলাকাবাসীর দাবি, ২০১০ সালের দিকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ অফিস করার অজুহাতে স্কুলের ভেতরে প্রথমে একটি টিনের ঘর তোলেন তিনি। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে শিক্ষকদের বাধা উপেক্ষা করে সেখানে গড়ে তোলেন তিনতলা বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন।

শিক্ষা কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহীদ মিনারের একদম লাগোয়া ভবনটি স্কুলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের দুই পাশে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছে টিনশেড ক্লাসরুম। বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা গেছে স্কুল মাঠের ভেতর দিয়েই, ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রধান ফটক নির্মাণ করতেও পারছে না।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হয় না। সকালবেলা এসেম্বলি করতে সমস্যা হয়, বড় কোনো অনুষ্ঠান বা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জায়গাও পাওয়া যায় না। ভবন থেকে মাঝে মাঝে আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা হয়, যার গন্ধে ক্লাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “আমি ২০১৬ সালে যোগদান করি। তার আগেই জোর করে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস, শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে বহুবার অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ পাইনি।”

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “বিশ্বের কোথাও কি শুনেছেন, স্কুলের ভেতরে কেউ ব্যক্তিগত বাড়ি করেছে? অথচ আমাদের এখানে ক্ষমতার জোরে তা করা হয়েছে। এখন জমি না থাকায় স্কুলের একটি ঘরও বাড়ানো যাচ্ছে না।”

স্থানীয়রা জানান, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের জমি ৯ জন ব্যক্তি দান করেছিলেন। ২০১৩ সালের দিকে জোর করে ভবন নির্মাণের পর, ২০২২ সালে একটি ভুয়া দলিল দেখিয়ে আব্দুল বাতেন জমি কিনেছেন বলে দাবি করেন এবং জমিদাতাদের হয়রানি করতে থাকেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল বাতেন বলেন, “২০২২ সালে আমি ৪ শতাংশের একটু কম জমি জমিদাতাদের কাছ থেকে কিনেছি, তাই বাড়ি করেছি। আওয়ামী লীগ সরকার বহুবার ভাঙার চেষ্টা করেও পারেনি।”

পাবনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো ব্যক্তিগত স্থাপনা চলবে না। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা। বিষয়টি আমি এখনই খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিদ্যালয়ের মাঝে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী নেতার ব্যক্তিগত ভবন শুধু বিদ্যালয়ের পরিবেশ ধ্বংস করছে না, বরং একটি প্রজন্মের শিক্ষা অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।

Tag :

Share This Post

About Author Information

স্কুলের মাঝখানে আ.লীগ নেতার তিনতলা ভবন, শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে

Update Time : ১২:২৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
পাবনার সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের নতুন বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার অবৈধভাবে নির্মিত তিনতলা ভবন শিক্ষার পরিবেশকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। শহীদ মিনার ঘেঁষে স্কুলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যক্তিগত ভবনটিকে কেন্দ্র করে ভোগান্তির শেষ নেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। দ্রুত ভবনটি উচ্ছেদ করে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্টরা।

ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণের অভিযোগের তীর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বাতেনের দিকে, যিনি ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা এবং সাবেক যুবলীগ নেতা। তিনি চরতারাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বাবুর চাচাতো ভাই। এলাকাবাসীর দাবি, ২০১০ সালের দিকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ অফিস করার অজুহাতে স্কুলের ভেতরে প্রথমে একটি টিনের ঘর তোলেন তিনি। পরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে শিক্ষকদের বাধা উপেক্ষা করে সেখানে গড়ে তোলেন তিনতলা বিশিষ্ট একটি পাকা ভবন।

শিক্ষা কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শহীদ মিনারের একদম লাগোয়া ভবনটি স্কুলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের দুই পাশে গাদাগাদি করে বসানো হয়েছে টিনশেড ক্লাসরুম। বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা গেছে স্কুল মাঠের ভেতর দিয়েই, ফলে স্কুল কর্তৃপক্ষ প্রধান ফটক নির্মাণ করতেও পারছে না।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হয় না। সকালবেলা এসেম্বলি করতে সমস্যা হয়, বড় কোনো অনুষ্ঠান বা বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার জায়গাও পাওয়া যায় না। ভবন থেকে মাঝে মাঝে আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা হয়, যার গন্ধে ক্লাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়ে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, “আমি ২০১৬ সালে যোগদান করি। তার আগেই জোর করে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। আমরা ডিসি অফিস, ইউএনও অফিস, শিক্ষা অফিসসহ বিভিন্ন দপ্তরে বহুবার অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ পাইনি।”

বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “বিশ্বের কোথাও কি শুনেছেন, স্কুলের ভেতরে কেউ ব্যক্তিগত বাড়ি করেছে? অথচ আমাদের এখানে ক্ষমতার জোরে তা করা হয়েছে। এখন জমি না থাকায় স্কুলের একটি ঘরও বাড়ানো যাচ্ছে না।”

স্থানীয়রা জানান, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের জমি ৯ জন ব্যক্তি দান করেছিলেন। ২০১৩ সালের দিকে জোর করে ভবন নির্মাণের পর, ২০২২ সালে একটি ভুয়া দলিল দেখিয়ে আব্দুল বাতেন জমি কিনেছেন বলে দাবি করেন এবং জমিদাতাদের হয়রানি করতে থাকেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আব্দুল বাতেন বলেন, “২০২২ সালে আমি ৪ শতাংশের একটু কম জমি জমিদাতাদের কাছ থেকে কিনেছি, তাই বাড়ি করেছি। আওয়ামী লীগ সরকার বহুবার ভাঙার চেষ্টা করেও পারেনি।”

পাবনার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মফিজুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো ব্যক্তিগত স্থাপনা চলবে না। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত জায়গা। বিষয়টি আমি এখনই খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বিদ্যালয়ের মাঝে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী নেতার ব্যক্তিগত ভবন শুধু বিদ্যালয়ের পরিবেশ ধ্বংস করছে না, বরং একটি প্রজন্মের শিক্ষা অধিকারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষা।