চলনবিলে অবাধে তৈরী হচ্ছে অবৈধ নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল; প্রশাসনের ভ্রুক্ষেপ নেই
- Update Time : ০৪:৪৯:১৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুলাই ২০২৪
- / ১১৪ Time View
নিজস্ব প্রতিবেদক :
পাবনায় বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে চলনবিলে খালবিলে নদী-নালায় ঢুকেছে নতুন পানি। বেড়েছে দেশী প্রজাতির মাছের আনাগোনা। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু মৎস্য শিকারীরা নেমেছে এসব দেশি প্রজাতির মাছ নিধনে। প্রতিদিন স্থানীয় হাট-বাজার গুলোতে বিক্রি হচ্ছে এ সব মাছ। বিশেষ করে ছোট মাছ , পোনা মাছ ডিম ওলা মাছ বিক্রি হচ্ছে বেশি।
এর মধ্যে চাহিদা বেড়েছে মাছ শিকারের বিভিন্ন উপকরণের। এর মধ্যে চাহিদা কারেন্ট জাল ও বেশি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল। তাই চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় গরে ওঠেছে ছোট ছোট কারখানা। আর এই কারখানায় অবাধে চলছে এসব চায়না দুয়ারী জাল তৈরী ও বিক্রি ।
এমনই এক অবৈধ কারখানার সন্ধান মিলেছে পাবনার চাটমোহরে। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের বোঁথর গ্রামে রয়েছে এই অবৈধ কারখানাটি। যেখানে দিনে দুপুরে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে তৈরী ও বিক্রি হচ্ছে অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল। বিলচলন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে “মাছ ধরার উপকরণ প্রস্তুতকারক ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান” ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে নির্বিঘ্নে তৈরি করছে নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের চেয়েও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারী জাল। এই অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল তৈরী করছেন সুশান্ত হলদার নামের এক অসাধু ব্যবসায়ী।
সম্প্রতি বিলচলন ইউনিয়নের বোঁথর চড়কবাড়ির পাশে অবস্থিত অবৈধ চায়না দুয়ারী জালের কারখানাটি। সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, কারখানাটির চারপাশ ইটের বাউন্ডারী দিয়ে ঘেড়া। লোহার গেটের ভিতরে ঢুকতেই চোখে পরে চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এ জাল তৈরীর বিভিন্ন উপকরণ। জালের মধ্যে প্রবেশ করানোর জন্য তৈরী করে রাখা হয়েছে চারকোনাকৃতির লোহার চিকন রডের ফ্রেম। আর এই রড গুলো ঢেকে দেওয়ার জন্য রয়েছে প্লাস্টিকের চিকন পাইপ। একটি কক্ষে স্তুপ করে রাখা রয়েছে বিপুল পরিমাণ নতুন জাল। পাশের শেডে ফ্রেমে তৈরী করা হচ্ছে অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, বেশ কিছুদিন যাবত এ বাড়িতে তৈরী হচ্ছে অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল। বাইরের কাউকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয় না। নারী-পুরুষ কারিগররা আসে যায়। এ বাড়িতে কি হচ্ছে তা এলাকার কেউ কেউ জানলেও, অনেকেরি অজানা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক কর্মচারীরা জানান, দুই সপ্তাহ হলো এখানে চায়না দুয়ারী জাল তৈরী হচ্ছে। সকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে কারিগররা আসেন জাল তৈরী করতে। তবে তাদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে বলেও জানান তারা।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা যায়, পাবনার ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা গ্রামের কালিপদ হলদারের ছেলে সুশান্ত হলদার ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরের জন্য চাটমোহরের ১১ নং বিলচলন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিথী ট্রেডার্সের নামে ২০৬ নং ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে বোঁথর গ্রামে চায়না দুয়ারী জালের এ কারখানা পরিচালনা করে আসছেন।
এ জাল সূক্ষাতিসুক্ষ্ম ভাবে মাছ আটকে রাখতে সক্ষম। জালের বুননে এক গিঁঠ থেকে আরেক গিঁঠের দূরত্ব খুব কম হওয়ায় মাছ বা অন্য কোন ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী একবার এ জালের মধ্যে প্রবেশ করলে আর বের হতে পারে না। অন্য জালের চেয়ে কম পরিশ্রমে চায়না দুয়ারী জাল দিয়ে অধিক পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়। ফলে এ এলাকার জেলেদের কাছে কদর বেড়েছে এ অবৈধ চায়না দুয়ারী জালের।
জেলেরা এখন মাছ ধরতে কারেন্ট জালের পরিবর্তে ঝুঁকছেন চায়না দুয়ারী জালের দিকে। উৎপাদন, বিক্রয়, বিপনন, ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও চাটমোহরের খাল, বিল, নদীগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার জাল পেতে মা ডিম ওলা মাছ ও পোনা মাছ নিধন করছেন অসাধু মৎসজীবিরা। ফলে ক্রমশই বিলুপ্তির পথে দেশী প্রজাতির মাছ। এ অবৈধ জালের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে মাছের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার শংকা রয়েছে। এই জাল ব্যাবহারের ফলে জলজ জীব বৈচিত্র হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিলচলন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতার হোসেন জানান, ’সিথী ট্রেডার্সের নামে “মাছ ধরার উপকরণ প্রস্তুত কারক ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান” ট্রেড লাইসেন্সটি আমার দেওয়া। তবে, মালিক সুশান্ত হলদার যে এই ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চায়না দুয়ারী জাল তৈরী করছেন তা আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে সুশান্ত হালদারের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি বলেন, ‘সব জায়গাতেই এভাবে চায়না দুয়ারী জাল বানানো কাজ টুকটাক চলছে । চাটমোহরের বোঁথড়ে একটা ছোট্ট জায়গায় আমরা অল্প কিছু দিন যাবত কাজ শুরু করেছি । কেবল মাত্র কাজ শেখাচ্ছি। সবাই তো আর এ কাজ জানে না। গত রোযার ঈদের আগে থেকে কারখানাটি চালু করছি । ওখানে আমার ভায়রা প্রকাশ হালদার দেখাশোনা করছে।’
এই জাল নিষিদ্ধ জানেন কিনা ও প্রশাসন জানে কিনা এ বিষয়ে সুশান্ত হালদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘নিষিদ্ধ কাজ জানি। তারপরও সবখানে তৈরি করছে, তাই আমিও একটু তৈরি করছি আর কি। এখন প্রশাসন যদি বলে করা যাবে না, তাহলে করবো না।’
সুশান্ত হালদারের ভায়রা প্রকাশ হালদারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘১৫ দিন হলো চালু করেছি। প্রশাসন জানে না। গোপনে চালাচ্ছি। এখানে হাজার হাজার টাকা ইনভেস্ট করেছি, আপনার যদি নিষেধ করেন তাহলে বন্ধ করে দেয়া লাগবে, তাছাড়া তো উপায় নাই।’
চায়না দুয়ারী জালের কারখানার বিষয়টি চাটমোহর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান শাকিল কে অবহিত করলে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেদুয়ানুল হালিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন।
আর এই বিষয়ে চাটমোহর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, ‘চায়না দুয়ারী জাল তৈরী, ব্যবহার, বিপনন, পরিবহন নিষিদ্ধ। বোঁথরে চায়না দুয়ারী জালের কারখানা রয়েছে বিষয়টি আমার জানা নেই। যত দ্রুত সম্ভব ইউএনও মহোদয়ের সাথে কথা বলে অভিযান চালানো হবে।










